ধরুন, আপনি ঢাকার ধানমন্ডিতে একটা ছোট বুটিক চালান। ফেসবুক পেজে ভালোই সাড়া পাচ্ছেন, ইনবক্সে রোজ মেসেজও আসে। তাহলে আলাদা ওয়েবসাইটের দরকার কী? অনেক উদ্যোক্তাই এই প্রশ্নটা করেন। উত্তরটা একটু ভেবে দেখলে পরিষ্কার হয়ে যায়।
১. ফেসবুক পেজ আপনার নিজের জায়গা নয়
ফেসবুক পেজ আসলে ভাড়া করা দোকানের মতো। নিয়ম বদলালে, রিচ কমে গেলে, কিংবা কোনো কারণে পেজ ডিজেবল হয়ে গেলে আপনার কিছুই করার থাকে না। বছরের পর বছর কষ্ট করে বানানো ফলোয়ার, রিভিউ আর ছবি এক রাতে হারিয়ে যেতে পারে। ওয়েবসাইট আপনার নিজের ডোমেইনে, নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকে। ওখানে কেউ আপনাকে বলে দিতে পারে না কী করতে হবে।
২. গুগলে খুঁজলে কাস্টমার যেন আপনাকে পায়
এখন মানুষ কিছু কিনতে বা কোনো সার্ভিস নিতে চাইলে প্রথমে গুগলে সার্চ দেয়। “ঢাকায় ভালো ক্যাটারিং সার্ভিস” বা “মিরপুরে এসি সার্വিসিং” টাইপ করে। আপনার ওয়েবসাইট না থাকলে এই সার্চে আপনি হাজির থাকবেন না, আর কাস্টমার চলে যাবে এমন কারো কাছে যার ওয়েবসাইট আছে। ফেসবুক পেজ গুগলে কিছুটা আসে বটে, কিন্তু একটা গোছানো ওয়েবসাইটের মতো জোরালোভাবে নয়।
৩. বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি হয়
অচেনা কারো কাছ থেকে টাকা দিয়ে কিছু কেনার আগে মানুষ একটু যাচাই করে। নিজের নামে ডোমেইন আর প্রফেশনাল ইমেইল (info@আপনারব্যবসা.com) দেখলে ক্রেতার ভরসা বাড়ে। ঠিকানা, যোগাযোগের নম্বর, “আমাদের সম্পর্কে” পেজ আর কাস্টমারদের মতামত থাকলে তিনি বুঝতে পারেন, এটা একটা সত্যিকারের প্রতিষ্ঠান। বিশেষ করে অনলাইনে প্রতারণার খবর যেখানে প্রায়ই শোনা যায়, সেখানে এই আস্থাটা অনেক বড় সম্পদ।
৪. দিনের ২৪ ঘণ্টা, সপ্তাহের ৭ দিন খোলা
আপনার দোকান রাত ১০টায় বন্ধ হয়, কিন্তু ওয়েবসাইট বন্ধ হয় না। রাত ১২টায় কেউ আপনার পণ্য দেখে পছন্দ করে অর্ডার দিয়ে রাখতে পারে। বিকাশ, নগদ বা কার্ড পেমেন্ট যুক্ত থাকলে সকালে উঠে দেখবেন অর্ডার জমে আছে। ইনবক্সে একই প্রশ্নের উত্তর বারবার দেওয়ার ঝামেলাও কমে, কারণ দাম, সাইজ, ডেলিভারি চার্জ সবই ওয়েবসাইটে লেখা থাকে।
৫. নিজের ব্র্যান্ড দাঁড় করানো যায়
ফেসবুকে সবার পেজ দেখতে প্রায় একই রকম, একই লেআউট আর একই ফন্ট। ওয়েবসাইটে আপনি নিজের রং, লোগো, গল্প আর স্টাইলে সবকিছু সাজাতে পারেন। মানুষ আপনার ব্র্যান্ডকে আলাদা করে চিনতে শুরু করে। দীর্ঘমেয়াদে বড় ব্যবসা গড়তে চাইলে এই আলাদা পরিচয়টা খুব কাজে লাগে।
৬. মার্কেটিংয়ে খরচ কমে, হিসাব সহজ হয়
ওয়েবসাইট থাকলে বোঝা যায় কত মানুষ এসেছে, কোন পণ্য বেশি দেখা হচ্ছে, কোন বিজ্ঞাপন থেকে অর্ডার আসছে। গুগল অ্যানালিটিক্সের মতো ফ্রি টুলে এসব তথ্য পাওয়া যায়। এতে অন্ধের মতো বিজ্ঞাপনে টাকা না ঢেলে যেটা কাজ করছে সেখানেই বাজেট বাড়াতে পারবেন। ব্লগ লিখে বা এসইও করে বিনা খরচেও নতুন কাস্টমার টানা সম্ভব।
৭. কাস্টমারের তথ্য আপনার হাতে থাকে
ওয়েবসাইটে নিউজলেটার সাবস্ক্রিপশন বা অর্ডার ফর্মের মাধ্যমে ক্রেতাদের ইমেইল ও ফোন নম্বর জমানো যায়। নতুন অফার বা ঈদ কালেকশন এলে সরাসরি তাদের জানাতে পারবেন। ফেসবুকের অ্যালগরিদমের ওপর ভরসা করে বসে থাকতে হবে না।
ওয়েবসাইট বানাতে কি অনেক টাকা লাগে?
এই ভুল ধারণাটা অনেককে পিছিয়ে রাখে। এখন ওয়ার্ডপ্রেস, শপিফাই বা ওয়িক্সের মতো প্ল্যাটফর্ম আছে, আর স্থানীয় ডেভেলপাররাও যুক্তিসংগত দামে কাজ করে দেন। একটা ডোমেইন আর হোস্টিং নিয়ে ছোট আকারে শুরু করলে বছরে খুব সামান্য খরচেই চালানো যায়। ব্যবসা বাড়লে ধীরে ধীরে ফিচার বাড়ানো যাবে। আগে ছোট করে শুরু করাটাই আসল।
শেষ কথা
ওয়েবসাইট এখন আর শখের জিনিস নয়, ব্যবসার ঠিকানা। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম বা ইউটিউব ব্যবহার করুন ঠিকই, কিন্তু সেগুলোকে আপনার ওয়েবসাইটে মানুষ আনার রাস্তা হিসেবে দেখুন। ব্যবসার মূল ভিত্তিটা নিজের হাতে রাখুন। আজ না করলে কাল হয়তো প্রতিযোগী এগিয়ে যাবে, তাই শুরুটা যত তাড়াতাড়ি করা যায় ততই ভালো।