ওয়েবসাইটের কথা তুললেই সবার প্রথম প্রশ্ন, “খরচ কত?” এর উত্তর একটা নম্বরে দেওয়া কঠিন। কেউ ৫ হাজার টাকায় সাইট বানিয়ে ফেলেন, আবার কেউ লাখ টাকা খরচ করেও সন্তুষ্ট হন না। ফারাকটা আসে আপনার দরকার কতটুকু, তার ওপর। চলুন খরচের প্রতিটা অংশ আলাদা করে দেখি।
ওয়েবসাইটের খরচ কয়েক ভাগে বিভক্ত
একটা সাইট চালু রাখতে সাধারণত চারটা খাতে টাকা যায়: ডোমেইন, হোস্টিং, ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট, আর পরে রক্ষণাবেক্ষণ। প্রথম দুটো প্রতি বছর দিতে হয়, তৃতীয়টা মূলত একবারের খরচ।
১. ডোমেইন: নিজের নামের ঠিকানা
ডোমেইন হলো আপনার সাইটের ঠিকানা, যেমন আপনারব্যবসা.com। এ বছরের জানুয়ারিতে বিটিসিএল .bd ডোমেইনের দাম প্রায় ৩৬ শতাংশ কমিয়েছে। নতুন দামে .com.bd ডোমেইনের নিবন্ধন ফি বছরে ৭০০ টাকা এবং নবায়ন ফি ১,০২০ টাকা। আর .bd ডোমেইনের (যেমন abc.bd) নিবন্ধন ১,২৮০ টাকা এবং নবায়ন ১,৬০০ টাকা। এর ওপর নির্ধারিত হারে ভ্যাট যোগ হবে।
meatechwatch
meatechwatch
সব মিলিয়ে ব্যবসার জন্য একটা ডোমেইনের খরচ বছরে হাজার টাকার আশপাশে। বিদেশি রেজিস্ট্রারের কাছ থেকে .com নিলে দাম আলাদা হতে পারে, কিন্তু সেটাও সাধারণত খুব বেশি নয়। কিছু স্থানীয় হোস্টিং কোম্পানি আবার নতুন হোস্টিং প্যাকেজের সঙ্গে প্রথম বছরের জন্য ডোমেইন ফ্রি দেয়, তবে দ্বিতীয় বছর থেকে স্বাভাবিক দামে নবায়ন করতে হয়। তাই অফার দেখে লাফিয়ে পড়ার আগে নবায়নের দামটা জেনে নিন। whtop
২. হোস্টিং: সাইটের জন্য জায়গা ভাড়া
হোস্টিং হলো সার্ভারে আপনার সাইটের ফাইল রাখার জায়গা। ছোট ব্যবসার সাইটের জন্য শেয়ার্ড হোস্টিংই যথেষ্ট, আর সেটা সাধারণত বছরে কয়েক হাজার টাকার মধ্যে পাওয়া যায়। ট্রাফিক বাড়লে বা অনলাইন দোকান বড় হলে ভিপিএস বা ক্লাউড হোস্টিংয়ে যেতে হয়, তখন খরচ বাড়ে। (হোস্টিংয়ের দামের এই কথাটা আমার সাধারণ ধারণা থেকে বলা, কোম্পানিভেদে অনেক তফাত হয়, তাই কেনার আগে কয়েকটা প্যাকেজ তুলনা করুন।)
৩. ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট: সবচেয়ে বড় খরচ
এখানেই দামের ব্যবধান সবচেয়ে বেশি। নির্ভর করে কী ধরনের সাইট চান, কোন প্রযুক্তিতে বানানো হবে, আর কার কাছ থেকে বানাচ্ছেন তার ওপর।
কোম্পানি বা তথ্যভিত্তিক সাইট: পাঁচ-ছয়টা পেজের একটা সাধারণ বিজনেস সাইট ওয়ার্ডপ্রেসে বানালে খরচ তুলনামূলক কম পড়ে। ফ্রিল্যান্সার বা ছোট এজেন্সির কাছে এটা কয়েক হাজার থেকে শুরু করে বিশ-ত্রিশ হাজার টাকার মধ্যে হয়ে যেতে পারে। কাস্টম ডিজাইন, বেশি পেজ বা বিশেষ ফিচার চাইলে খরচ বেড়ে যায়। এই রেঞ্জটাও আমার সাধারণ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বলা, তাই একাধিক জায়গা থেকে কোটেশন নিন।
ই-কমার্স সাইট: অনলাইনে পণ্য বিক্রি করতে চাইলে কার্ট, পেমেন্ট, অর্ডার ব্যবস্থাপনা সবই লাগে, তাই খরচও বেশি। বাংলাদেশের একটা তালিকাভিত্তিক সাইটে জুলাই ২০২৬-এর দাম এরকম দেখা গেছে:
লারাভেল দিয়ে ই-কমার্স সাইট: ২১,০০০ টাকা, পিএইচপি দিয়ে: ২৫,০০০ টাকা, শপিফাই দিয়ে: ৩২,০০০ টাকা
প্রফেশনাল লারাভেল ই-কমার্স: ৩৫,০০০ টাকা, মাল্টি-ভেন্ডর (একাধিক বিক্রেতার) সাইট: ৫০,০০০ টাকা
লারাভেল, রিয়্যাক্ট ও নোড.জেএস দিয়ে বানানো বড় ই-কমার্স সাইট: ৮৫,০০০ টাকা
ওয়ার্ডপ্রেসে ই-কমার্স সাইট বানাতে ন্যূনতম খরচ ২৭,০০০ টাকা
মনে রাখবেন, এগুলো একটা তালিকা-সাইটের প্রকাশিত দাম, বাস্তবে কাজ শুরুর আগে চাহিদা অনুযায়ী দর বদলে যায়। দাম একটা আনুমানিক ধারণা দেওয়ার জন্যই ভালো, চূড়ান্ত হিসাব হিসেবে নয়।
৪. রক্ষণাবেক্ষণ ও আনুষঙ্গিক খরচ
সাইট চালু হলেই কাজ শেষ হয় না। প্রতি বছর ডোমেইন ও হোস্টিং নবায়ন করতে হয়। সাইটের সফটওয়্যার আপডেট, নিরাপত্তা, ব্যাকআপ আর মাঝে মাঝে কনটেন্ট বদলানোর জন্যও কিছু খরচ ধরে রাখা ভালো। কোনো ডেভেলপার মাসিক সার্ভিস চার্জ নেন, কেউ আবার কাজ অনুযায়ী বিল করেন। কাজ বুঝিয়ে দেওয়ার সময় এই বিষয়টা আগেই পরিষ্কার করে নিন।
কোন পথে গেলে কেমন খরচ?
নিজে বানানো (ওয়েবসাইট বিল্ডার): ওয়িক্স বা এ ধরনের টুলে নিজেই টেনে-ছেড়ে বানানো যায়। শুরুতে খরচ কম, তবে ডলারে মাসিক চার্জ দিতে হয়, আর ফিচার ও এসইও নিয়ন্ত্রণে সীমাবদ্ধতা থাকে।
ফ্রিল্যান্সার: বাংলাদেশে ওয়েব ডেভেলপমেন্ট ও ওয়ার্ডপ্রেসে দক্ষ ফ্রিল্যান্সার প্রচুর। দাম তুলনামূলক কম, তবে কাজের মান ও জবাবদিহি যাচাই করে নিতে হবে। আগের কাজের লিংক চেয়ে দেখুন।
স্থানীয় এজেন্সি: খরচ বেশি, তবে ডিজাইনার, ডেভেলপার ও সাপোর্ট এক জায়গায় পাওয়া যায়, আর পরে সমস্যা হলে দায়িত্ব নেওয়ার মতো একটা প্রতিষ্ঠান থাকে।
টাকা বাঁচানোর কয়েকটা কাজের পরামর্শ
ছোট করে শুরু করুন। প্রথমে মূল পেজ আর অর্ডারের ব্যবস্থা নিয়ে নামুন, ব্যবসা বাড়লে ফিচার যোগ করুন।
ওয়ার্ডপ্রেসের মতো জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্ম বেছে নিন। এতে ভবিষ্যতে ডেভেলপার বদলানো সহজ হয়।
একাধিক কোটেশন নিন। কী কী কাজ ধরা আছে, আর কী বাদ, সেটা লিখিতভাবে জেনে নিন।
ডোমেইন ও হোস্টিং নিজের নামে কিনুন। ডেভেলপারের নামে কিনলে পরে ঝামেলা হতে পারে।
খুব সস্তা অফার থেকে সাবধান। নবায়নের দাম, গোপন চার্জ আর সাপোর্টের শর্ত না দেখে সই করবেন না।
শেষ কথা
বাংলাদেশে ওয়েবসাইট বানানো এখন আগের চেয়ে অনেক সাশ্রয়ী। ডোমেইনের দাম কমেছে, স্থানীয় ডেভেলপারের সংখ্যাও অনেক। আপনার বাজেট যত বড়ই হোক, আগে ঠিক করুন সাইটটা দিয়ে কী করতে চান। উদ্দেশ্য পরিষ্কার থাকলে অপ্রয়োজনীয় ফিচারে টাকা নষ্ট হয় না, আর সঠিক জায়গায় বিনিয়োগ করা যায়।