ওয়েবসাইট বানানো এক জিনিস, আর কাস্টমারকে কাজে লাগে এমন ওয়েবসাইট বানানো আরেক জিনিস। অনেক ব্যবসার সাইটে ঢুকলে মনে হয় ঘর সাজানো হয়েছে ঠিকই, কিন্তু দরকারি কথাটাই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। একজন ভিজিটর সাধারণত কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ঠিক করে ফেলেন, তিনি থাকবেন নাকি বেরিয়ে যাবেন। তাই শুরুতেই জেনে নেওয়া ভালো, একটা প্রফেশনাল সাইটে কোন জিনিসগুলো থাকা দরকার।
১. পরিষ্কার হোমপেজ
হোমপেজ হলো আপনার দোকানের সামনের দরজা। এখানে ঢুকেই ভিজিটর যেন তিনটা প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যান: আপনি কী করেন, কাদের জন্য করেন, আর তিনি এরপর কী করবেন। একটা সহজ হেডলাইন, দুই-তিন লাইনের পরিচয়, আর একটা স্পষ্ট বাটন (যেমন “অর্ডার করুন” বা “যোগাযোগ করুন”) থাকলেই কাজ হয়ে যায়। অকারণ স্লাইডার আর ভারী অ্যানিমেশন দিয়ে ভরে ফেললে উল্টো মানুষ বিরক্ত হয়।
২. সহজ নেভিগেশন মেনু
মেনু দেখে যেন মানুষ নিজে নিজেই বুঝে নিতে পারে কোথায় কী আছে। হোম, আমাদের সম্পর্কে, সার্ভিস বা প্রোডাক্ট, ব্লগ আর যোগাযোগ, এই কয়েকটা পাতাই যথেষ্ট। মেনুতে দশ-বারোটা অপশন ঠেসে দিলে ভিজিটর দিশেহারা হয়ে যান।
৩. “আমাদের সম্পর্কে” পেজ
মানুষ অচেনা কোম্পানির কাছ থেকে কিনতে ভয় পায়, আর এই পেজটাই সেই ভয় কমায়। আপনার ব্যবসা কীভাবে শুরু হলো, কারা কাজ করছেন, আপনারা কী বিশ্বাস করেন, এসব গল্পের মতো করে লিখুন। টিমের আসল ছবি দিলে আরও ভালো, স্টক ফটোর চেয়ে আসল মুখ অনেক বেশি আস্থা তৈরি করে।
৪. প্রোডাক্ট বা সার্ভিসের বিস্তারিত পেজ
আপনি কী বিক্রি করছেন, সেটা খুলে বলুন। প্রোডাক্ট হলে ভালো ছবি, দাম, সাইজ বা স্পেসিফিকেশন, ডেলিভারির সময় থাকা চাই। সার্ভিস হলে কী কী কাজ করেন, কীভাবে কাজ করেন আর কাস্টমার কী সুবিধা পাবেন, সেটা সহজ ভাষায় লিখুন। “দাম জানতে ইনবক্সে মেসেজ দিন” লিখে রাখলে অনেক ভিজিটর সেখানেই চলে যান।
৫. যোগাযোগের তথ্য ও যোগাযোগ ফর্ম
ঠিকানা, ফোন নম্বর, ইমেইল, হোয়াটসঅ্যাপ আর অফিস খোলা থাকার সময় এক জায়গায় রাখুন। সঙ্গে একটা ছোট ফর্ম দিন যাতে নাম, নম্বর আর বার্তা লিখে পাঠানো যায়। দোকান বা অফিস থাকলে গুগল ম্যাপ বসিয়ে দিলে কাস্টমারের খুঁজে পেতে সুবিধা হয়। ফর্ম যত ছোট হবে, মানুষ তত বেশি পূরণ করবে।
৬. কাস্টমারের রিভিউ ও কাজের নমুনা
নিজের মুখে নিজের প্রশংসা করার চেয়ে অন্যের মুখে শোনা কথার ওজন অনেক বেশি। সন্তুষ্ট ক্রেতাদের মতামত, আগের কাজের ছবি বা ছোট কেস স্টাডি রাখুন। বিখ্যাত কোনো ক্লায়েন্ট থাকলে তাদের লোগোও দেখাতে পারেন। তবে ভুয়া রিভিউ কখনোই দেবেন না, ধরা পড়লে বিশ্বাসযোগ্যতা একেবারে শেষ।
৭. মোবাইলে ঠিকঠাক চলে এমন ডিজাইন
আমাদের দেশে বেশিরভাগ মানুষ ফোনেই ইন্টারনেট চালান। কম্পিউটারে সুন্দর দেখালেও মোবাইলে লেখা ছোট হয়ে গেলে বা বাটন চাপা না গেলে ভিজিটর সাইট ছেড়ে চলে যাবেন। তাই ডিজাইন করার সময় আগে ফোনে কেমন দেখাবে সেটা ভাবুন, তারপর কম্পিউটারের কথা।
৮. দ্রুত লোড হওয়া
পাতা খুলতে বেশি সময় লাগলে মানুষ অপেক্ষা করে না। বিশেষ করে ধীরগতির নেটওয়ার্কে এটা আরও বড় সমস্যা। ছবির সাইজ ছোট করে দিন, অপ্রয়োজনীয় প্লাগইন বাদ দিন, আর ভালো মানের হোস্টিং বেছে নিন।
৯. নিরাপত্তা (SSL সার্টিফিকেট)
ঠিকানার শুরুতে https আর তালার চিহ্ন না থাকলে ব্রাউজার “Not Secure” লিখে সতর্ক করে দেয়। এটা দেখলে কেউ আর আপনার সাইটে নাম, ফোন নম্বর বা পেমেন্টের তথ্য দিতে চাইবে না। SSL এখন প্রায় সব হোস্টিংয়েই বিনামূল্যে পাওয়া যায়, তাই এটা বাদ রাখার কোনো কারণ নেই। সাইট নিয়মিত আপডেট রাখা আর ব্যাকআপ নেওয়াও জরুরি।
১০. সার্চ ইঞ্জিনের উপযোগী কাঠামো (SEO)
গুগলে আপনাকে খুঁজে পাওয়া না গেলে সুন্দর সাইট বানিয়েও লাভ নেই। প্রতিটা পাতার জন্য আলাদা টাইটেল আর বর্ণনা লিখুন, ছবিতে বর্ণনামূলক নাম দিন, আর মানুষ যে শব্দে খোঁজে সেই শব্দগুলো স্বাভাবিকভাবে লেখার মধ্যে রাখুন। স্থানীয় ব্যবসা হলে গুগল বিজনেস প্রোফাইলের সঙ্গে সাইটটা জুড়ে দিন।
১১. ব্লগ বা তথ্যের অংশ
নিয়মিত কাজের কথা, টিপস বা কাস্টমারের সাধারণ প্রশ্নের উত্তর লিখলে সাইটে নতুন মানুষ আসে। এটা আপনাকে সেই বিষয়ের জানা-বোঝা মানুষ হিসেবেও পরিচিত করে। একটা “সচরাচর জিজ্ঞাসা” (FAQ) পেজ থাকলে ইনবক্সে একই প্রশ্ন বারবার আসাও কমে।
১২. পেমেন্ট ও অর্ডারের ব্যবস্থা
অনলাইনে বিক্রি করলে বিকাশ, নগদ, কার্ড আর ক্যাশ অন ডেলিভারির মতো পরিচিত অপশন রাখুন। সঙ্গে রিটার্ন ও রিফান্ড নীতি, ডেলিভারি চার্জ আর সময়ের তথ্য স্পষ্ট করে লিখে দিন। এই তথ্য লুকিয়ে রাখলে ক্রেতা শেষ ধাপে এসেও কেনা বাদ দেন।
১৩. প্রাইভেসি পলিসি ও শর্তাবলী
এগুলো ছোট ব্যাপার মনে হলেও প্রফেশনাল সাইটের চিহ্ন। আপনি ক্রেতার তথ্য কীভাবে ব্যবহার করেন আর কেনাকাটার নিয়মকানুন কী, সেটা পরিষ্কার লেখা থাকলে মানুষ নিশ্চিন্তে এগোতে পারে। সাইটের নিচের অংশে (ফুটারে) এগুলোর লিংক রাখুন।
১৪. সোশ্যাল মিডিয়া লিংক ও অ্যানালিটিক্স
ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম বা ইউটিউবের লিংক দিয়ে রাখুন যাতে আগ্রহী মানুষ সেখানেও আপনাকে ফলো করতে পারে। আর সাইটে গুগল অ্যানালিটিক্স বসিয়ে নিন। এতে বুঝতে পারবেন কারা আসছে, কোন পাতা বেশি দেখা হচ্ছে আর কোথায় এসে মানুষ চলে যাচ্ছে। এই তথ্য দেখে সাইট ঠিক করলে ফল অনেক ভালো আসে।
- একনজরে চেকলিস্ট
- স্পষ্ট হোমপেজ ও সহজ মেনু
- আমাদের সম্পর্কে ও যোগাযোগ পেজ
- প্রোডাক্ট বা সার্ভিসের পূর্ণ বিবরণ
- কাস্টমার রিভিউ ও কাজের নমুনা
- মোবাইল-ফ্রেন্ডলি ডিজাইন ও দ্রুত লোডিং
- SSL নিরাপত্তা ও নিয়মিত ব্যাকআপ
- মৌলিক SEO ও ব্লগ
- পেমেন্ট, রিটার্ন ও প্রাইভেসি পলিসি
- সোশ্যাল লিংক ও অ্যানালিটিক্স
- শেষ কথা
প্রফেশনাল ওয়েবসাইট মানে দামি ডিজাইন বা চোখধাঁধানো এফেক্ট নয়। মানে হলো, ভিজিটর যা জানতে এসেছেন তা সহজে পেয়ে যাচ্ছেন, আপনাকে বিশ্বাস করতে পারছেন, আর পরের ধাপে কী করতে হবে বুঝতে পারছেন। সব কিছু একসঙ্গে বসাতে না পারলেও সমস্যা নেই। আগে মৌলিক জিনিসগুলো ঠিকভাবে বানান, তারপর ব্যবসার সঙ্গে সঙ্গে ধীরে ধীরে সাইটটাকে বড় করুন।